গরমে বাচ্চাদের সুস্থ থাকার উপায়
গরমে বাচ্চাদের সুস্থ থাকার উপায়:
গরমের সময় শিশুদের শরীর খুব দ্রুত পানিশূন্য হয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত তাপ, ঘাম, রোদ ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে শিশুদের নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় গরমে তাদের বাড়তি যত্ন প্রয়োজন। তাই এই সময়ে শিশুর খাবার, পানি, পোশাক, ঘুম, খেলাধুলা ও পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।
পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার
গরমে শিশুর শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে প্রচুর পানি বের হয়ে যায়। তাই শিশুকে নিয়মিত পানি পান করাতে হবে। শিশু যদি খেলাধুলা করে বা বেশি ঘামে, তাহলে তাকে আরও ঘন ঘন পানি দিতে হবে। শুধু তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে অল্প অল্প করে বারবার পানি পান করানোর অভ্যাস করা ভালো।
পানির পাশাপাশি ডাবের পানি, পাতলা ডাল, স্যুপ ও পানিসমৃদ্ধ ফল দেওয়া যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত চিনি দেওয়া কোমল পানীয় বা কৃত্রিম জুসের পরিবর্তে স্বাভাবিক ও পুষ্টিকর তরল খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো
গরমে অনেক শিশুর খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। এ সময় জোর করে বেশি খাবার না দিয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার খাবার দেওয়া যেতে পারে। ভাত, ডাল, মাছ, ডিম, শাকসবজি, ফল ও দুধসহ সুষম খাবার শিশুর দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখা প্রয়োজন।
তরমুজ, বাঙ্গি, শসা, কমলা, পেয়ারা ইত্যাদি পানিসমৃদ্ধ ফল শিশুর শরীরে পানির ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে। ফল ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে খাওয়াতে হবে।
হালকা ও আরামদায়ক পোশাক
গরমের দিনে শিশুকে ঢিলেঢালা ও হালকা সুতির পোশাক পরানো ভালো। খুব আঁটসাঁট বা ভারী পোশাক শরীরের তাপ বের হতে বাধা দিতে পারে এবং শিশুকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। বাইরে বের হলে বয়স অনুযায়ী টুপি বা ছাতা ব্যবহার করা যেতে পারে।
সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা
দুপুরের তীব্র রোদে শিশুদের বাইরে খেলতে না দেওয়াই ভালো। প্রয়োজন হলে সকাল বা বিকেলের তুলনামূলক ঠান্ডা সময়ে বাইরে খেলতে দেওয়া যেতে পারে। বাইরে থাকার সময় শিশুকে ছায়ায় রাখা এবং নিয়মিত পানি পান করানো জরুরি।
শিশুকে কখনোই রোদে বা গরম গাড়ির ভেতরে একা রেখে যাওয়া উচিত নয়। অল্প সময়ের মধ্যেই গাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
ঘর ঠান্ডা ও বাতাস চলাচল উপযোগী রাখা
শিশুর ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ফ্যান বা প্রয়োজন অনুযায়ী শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শিশুকে সরাসরি খুব ঠান্ডা বাতাসের সামনে না রাখাই ভালো। ঘর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে পর্দা টেনে রোদের তাপ কমানো এবং সম্ভব হলে জানালা দিয়ে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
নিয়মিত গোসল ও পরিচ্ছন্নতা
গরমে শিশুর শরীরে বেশি ঘাম হয়। তাই নিয়মিত গোসল করানো এবং ঘাম হলে পরিষ্কার পানি দিয়ে শরীর মুছে দেওয়া ভালো। ঘামে ভেজা পোশাক দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে। শিশুর হাত-পা, মুখ ও শরীর পরিষ্কার রাখলে বিভিন্ন জীবাণুর সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
বিশেষ করে খাবারের আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করানো জরুরি।
ঘুম ও বিশ্রাম
গরমে পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমানোর জায়গা পরিষ্কার, আরামদায়ক ও অতিরিক্ত গরমমুক্ত রাখতে হবে। শিশুর বয়স অনুযায়ী নিয়মিত ঘুম ও বিশ্রামের সময় নিশ্চিত করা উচিত।
খাবারের নিরাপত্তায় সতর্কতা
গরমে খাবার দ্রুত নষ্ট হতে পারে। দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা রান্না করা খাবার শিশুকে না দেওয়াই নিরাপদ। ফলমূল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়াতে হবে। রাস্তার খোলা খাবার, অপরিষ্কার পানি, অতিরিক্ত ঝাল বা তেলযুক্ত খাবার থেকে শিশুকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা উচিত।
বিশেষ করে ডায়রিয়া বা বমির মতো সমস্যা হলে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিশুকে পর্যাপ্ত তরল দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
খেলাধুলার সময় নজর রাখা
শিশুরা খেলতে গিয়ে অনেক সময় পানি পান করার কথা ভুলে যায়। তাই অভিভাবকদের নিয়মিত বিরতি দিয়ে পানি পান করাতে হবে। অতিরিক্ত গরমে দীর্ঘ সময় দৌড়ঝাঁপ বা কঠোর শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা ভালো।
শিশু যদি অতিরিক্ত ঘামে, দুর্বল হয়ে যায়, মাথা ঘোরে, মাথাব্যথা হয়, বমি করে, অস্বাভাবিকভাবে ঘুমঘুম বা বিভ্রান্ত দেখায়, তাহলে তাকে দ্রুত ঠান্ডা জায়গায় নিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
ত্বকের যত্ন
গরমে ঘামাচি বা ত্বকে জ্বালাপোড়া হতে পারে। শিশুর ত্বক শুকনো ও পরিষ্কার রাখতে হবে। ঘাম জমে থাকে এমন জায়গা, যেমন ঘাড়, বগল ও শরীরের ভাঁজগুলো নিয়মিত পরিষ্কার ও শুকনো রাখা ভালো। খুব বেশি পাউডার বা সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহারের পরিবর্তে শিশুর ত্বকের জন্য উপযোগী পণ্য ব্যবহার করা উচিত।
মশা ও পোকামাকড় থেকে সুরক্ষা
গরম ও বর্ষার সময়ে মশার উপদ্রব বাড়তে পারে। শিশুর ঘুমানোর জায়গা পরিষ্কার রাখতে হবে এবং প্রয়োজন হলে মশারি ব্যবহার করা যেতে পারে। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা জরুরি, কারণ জমে থাকা পানিতে মশা বংশবিস্তার করতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন
গরমে শিশুর জ্বর, বারবার বমি, তীব্র ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অচেতনভাব, খিঁচুনি বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। শিশু খুব কম প্রস্রাব করলে, মুখ শুকিয়ে গেলে, কান্নার সময় চোখের পানি না এলে বা অতিরিক্ত নিস্তেজ হয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
শেষ কথা
গরমে শিশুদের সুস্থ রাখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যাপ্ত পানি, পুষ্টিকর খাবার, আরামদায়ক পোশাক, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি তীব্র রোদ ও অতিরিক্ত গরম থেকে শিশুকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। শিশুর আচরণ ও শারীরিক অবস্থার পরিবর্তনের দিকেও অভিভাবকদের নজর রাখা জরুরি। সামান্য সচেতনতা ও নিয়মিত যত্নের মাধ্যমে গরমের সময় শিশুকে অনেকটাই সুস্থ, স্বস্তিতে ও স
লিড ফরগ; আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url